Sunday, November 4, 2018

নেশা

নেশা, অর্থাৎ আসক্তি। এই মুহূর্তে ঘড়িতে রাত ২টো বেজে ৪০ মিনিট। তারিখটা ৫ই নভেম্বর ২০১৮। হঠাৎ মনে হতেই পারে নেশা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লেখার সময় কিংবা তারিখের উল্লেখ আদৌ প্রয়োজন আছে? তাই আগেই বলে রাখি ব্লগটা আমার কাছে দিনলিপির মতোন; কিছু কল্পনা কিছু বাস্তব কিছু সত্যি কিছু মিথ্যে। জীবনের নালিশ আর কি! যাই হোক, নেশা ছিল মূল আলোচ্য। নেশা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা হল
একেবারে সরাসরি তথ্য, যাকে বলে কিনা ফার্স্ট হ‍্যান্ড ইনফরমেশন। আমি সেই ছেলেবেলা থেকেই আসক্ত। কিসে আসক্ত সেই কথায় পরে আসছি। এই আসক্তির পেছনে প্রত‍্যেকটি পৃথক ব‍্যক্তির স্বতন্ত্র কারন থাকে। আমার এই কারনটি ছেলেবেলা থেকেই ধ্রুবক। ছেলেবেলা থেকে বয়ঃসন্ধি, তার থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা; সবেতেই নেশার দ্রব্যের পরিবর্তন হলেও নেশার কারনটি কোনো অংশে কোনোদিন বিচলিত হয়নি। এই কারণটি হলো যাকে বাংলায় বলে পলায়ন প্রবৃত্তি আর ইংরেজিতে 'এসকেপিজম'( Escapism )। বলতে এতটুকু দ্বিধা নেই যে আমি ছেলেবেলা থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক সব সময় এস্ক্যাপিস্ট। এবার আসি নেশারদ্রব্যের কথায়। ছেলেবেলায় সব সময় ছোট না হয় বড় হতে চাইতাম। এই বড় হওয়ার বাসনায় আমি আর আমার দিদি মিলে, খেলতাম বড় হওয়ার খেলা। সেখানে একটা অন্য জগৎ ছিল, বড়দের অনুকরণে গড়ে ওঠা আমাদের একটা কল্পনার জগৎ। জানিনা, আসল বড় হওয়ার জগতের সাথে তার কতটা মিল ছিল! খেলার মাধ্যমেই যেন জীবনের সবকিছু পেয়ে গেছি, আর মনে মনে ভাবতাম বড় হলেই বুঝি সব পাওয়া যায়। এই খেলার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। এই ছিল আমার ছেলেবেলা পলায়ন প্রবৃত্তি। যদিও ফ্রয়েড(Freud) এই খেলাকেই 'ডে ড্রিমিং' ( Day Dreaming ) নাম দিয়ে তার থিওরিতে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেই খেলা আমার কাছে ছিল এক নেশার মত। এরপর এল বয়সন্ধি। ছেলে বেলার সেই নেশায় কোন ক্ষতি ছিল না, অন্তত সমাজের চোখ রাঙানি ছিল না; আসলে কেউ জানতেই পারত না। বয়ঃসন্ধিতে এসে নেশার সংজ্ঞাটি পাল্টে গেল; কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে ভাবতে হয় আদৌ কি সংজ্ঞা পাল্টে ছিল? আসলে নেশার নতুন নতুন দরজা খুলে যাচ্ছিল। কিন্তু ওই যে বলছিলাম কারণটা  বরাবরই অনড়। আমার পলায়ন প্রবৃত্তি। বয়ঃসন্ধিতে এক অন্য নেশা পেয়ে বসল। আমি পড়লাম অলীক কাহিনী (Fiction) দের প্রেমে। সবাই ভাববে অলীক কাহিনী মানে নিশ্চয়ই গল্পের বই, কিন্তু তা নয়। হ্যাঁ গল্পের বই অবশ্যই ছিল, সবচেয়ে বেশি আমাদের আকৃষ্ট করলো সেটা হচ্ছে চলচ্চিত্র। একটার পর একটা চলচ্চিত্রের মোহে বুঁদ হয়ে থাকতাম। এখান থেকেই সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক,  টারান্টিনো, স্কর্সেসে, মৃণাল সেন হয়ে মীরা নায়ার, দীপা মেহতা ও আরো কত কে! এক একটি চলচ্চিত্র যেন এক একটি নতুন জীবন। কখনো আমি সাদামাটা চাকুরীজীবী তো কখন এ আমি কস্টিউমের ওপরে আন্ডারওয়ার পরে মানব জাতিকে বাঁচাতে চলেছি। রোজকার থোড়-বড়ি-খাড়া জীবনে এই নেশা এক অন্যরকম নেশা। এই নেশায় অনেক অভিজ্ঞতা আছে, অভিজ্ঞতার ব্যথা আছে,  কিন্তু ব্যথার অনুভূতি নেই; এক অন্য রকম মজা না? চলচ্চিত্রে সাথে সাথেই এক অন্য রকমের নেশা ও পাশাপাশি ছিল। টিভি সিরিজ দেখার নেশা। টিভি সিরিজের নেশা চলচ্চিত্র থেকেও মারাত্মক। এখানে অন্যের জীবন যেন আমার উপর ভর করত। সময়ের অল্প পরিসর চলচ্চিত্রে চরিত্রগুলোকে আত্মস্থ করতে দিত না কিন্তু সেখানে টিভি সিরিজের চরিত্রগুলো আমার সাথে পুরো একাত্ম হয়ে যেত। কখন আমি ওয়াল্টার হোয়াইট তো কখনো আমি টেড মোসবি, কখনো আমি চ‍্যান্ডলার বিং তো কখনো আমি পিটার গ্রিফিন কিংবা কখনো আমি ডন ড্রেপার। অন্ধকার ঘর, ল্যাপটপের স্ক্রিন আর আমি এ যেন এক হোলি ট্রিনিটি। এভাবেই দূর থেকে সমস্ত জীবনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে নিজেকে সর্ব শক্তি সম্পন্ন মনে হতে লাগলো। মনে হত যে এই দুনিয়খর সব অভিজ্ঞতাই আমার হাতের মুঠোয়। আর কিছু দেখার বাকি নেই সবই দেখা এখন এই পলায়ন প্রবৃত্তির থেকে পলায়ন করতে হবে। এরপরে অন্ধকার অধ্যায়। আসক্তি এবার তার আসল রূপ নিল। অভিজ্ঞতা তো আর কিছু বাকি নেই, তাই পলায়ন করতে হবে অভিজ্ঞতা থেকেও। মনে হতে লাগলো জীবনের সময় গুলো যেন বন্ধ হয়ে যায়। সবাই এটার সাথে আত্মঘাতী মানসিকতার ( Suicidal Tendency )তুলনা করতে পারে, কিন্তু সেটা সম্পূর্ন আলাদা। এটা অনেকটা নিহিলিস্ট ( Nihilist ) মানসিকতা। সবকিছুই কেমন নিরর্থক, সবকিছুই উদ্দেশ্যহীন, যুক্তিহীন। কিছুরই কোন কারণ নেই, সবকিছুই তো দেখা আর দেখে কি হবে ,এই মনোভাব সব সময় মস্তিষ্ককে জর্জরিত করতে লাগলো। মনটা বাস্তবে থাকতে চাইছে না, পর্দায় তো পরাবাস্তব বহুবার হয়ে গেছে। এবার চারপাশের জগতে ঘরের দরজা খুলে সেই হোলি ট্রিনিটি থেকে যখন বের হলাম; তখন চারিদিকে পৃথিবীটাই পরাবাস্তব ভাবে দেখতে ইচ্ছে করছে। ব্যাস শুরু হয়ে গেল সেই পরাবাস্তব ঘর খোঁজা। নেশার দ্রব্য পরিবর্তিত হল। নেশার মাত্রা বাড়তে লাগলো। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা সেই চাওয়া সেই পরাবাস্তব কে খুঁজে বার করা কোনোদিন আর হয়ে ওঠে না। আর আসল জীবনে সেই সুখ টা কোথায় লুকিয়ে আছে সেটাও তো পাওয়া যায় না । নেশার মাত্রা তখন সপ্তমে। শরীর নেশায় ভারাক্রান্ত ও জর্জরিত। কিন্তু মন তো শরীরকে মানছে না। মন চাইছে আরো আরো, কিন্তু সে ধনী দুনিয়া ধরি ধরি করি কিন্তু ধরা পড়ে না। এদিকে বাস্তব দুনিয়া গেছে চুলোয়। একদিন হঠাৎ কি মনে হতে সেই আসক্তি ও বিসর্জন দিলাম। তখন অফুরন্ত সময় কিন্তু নিহিলিস্ট হওয়া বন্ধ হল না। মন তখন নেশা থেকেও পলায়ন চাইছে। নতুন নেশা খুঁজছে। কিন্তু এ যেন ঠিক রাস্তার শেষ মাথা। নেশার বিসর্জন দিলাম যদিও কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগল এবার?
ক্রিস্টোফার নোলানের 'ফলোয়িং'( Following ) সিনেমার এক অংশে একটা কথা ছিল যে মানুষ যদিও গোপনে ডাইরি লেখে কিন্তু মনেমনে সে চায় যে সেটা সবাই পড়ুক। ব্যাস এটুকুই; বাকিটা বুঝে নেবেন।




PAINTING: 21ST CENTURY CACOPHONY
ARTIST: ME

© Avishek Ghosh